ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরনগরী হাইফায় অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে বড় তেল রিফাইনারিতে আবারও মিসাইল হামলা হয়েছে। সোমবার রাতে ইরান ও হিজবুল্লাহর যৌথ মিসাইল হামলায় বাজান (Bazan) অয়েল রিফাইনারিতে আগুন ধরে যায় এবং ঘন কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে, তবে স্থানীয় মিডিয়া ও ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে যে পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক।
এটি চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ-এর মধ্যে রিফাইনারিটিতে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা। মার্চ মাসের শুরুতে ইরানের সরাসরি মিসাইল হামলায়ও এই একই স্থাপনায় আঘাত লেগেছিল। ইসরায়েলের এনার্জি মন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, হামলায় “কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি” হয়নি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হলেও দ্রুত পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুসারে, মিসাইলের টুকরো পড়ে রিফাইনারির দুটি স্থানে আগুন লেগেছিল।
হাইফা ইসরায়েলের তৃতীয় বৃহত্তম শহর এবং এই রিফাইনারি দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহের প্রায় অর্ধেক উৎপাদন করে। এখানে যদি বড় ধরনের ক্ষতি হয়, তাহলে ইসরায়েলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়তে পারে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে যে, তারা হাইফা ও আশদোদের রিফাইনারি সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে “সুনির্দিষ্ট” মিসাইল হামলা চালিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামলার পর সাইরেন বেজে উঠলে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যান। এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF) বলছে, অনেক মিসাইল আকাশপথে প্রতিরোধ করা হয়েছে, কিন্তু কিছু টুকরো রিফাইনারি এলাকায় পড়ে আগুনের সূত্রপাত ঘটায়।এই হামলা ইরান যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান বলছে, এটি তাদের তেলক্ষেত্র ও এনার্জি অবকাঠামোতে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রতিশোধ। অন্যদিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা প্রয়োজনে আরও কঠোর জবাব দেবে। হিজবুল্লাহও এই হামলায় অংশ নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা লেবানন সীমান্তের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তেল রিফাইনারি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর মাধ্যমে ইরান আসলে ইসরায়েলের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে চাইছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন নয়, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইসরায়েলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস দ্রুত কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে রিফাইনারির কিছু অংশে উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতকেও সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে তার ঢেউ আছড়ে পড়বে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না।
হাইফার এই হামলা চলমান সংঘাতের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেছে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যতদিন না দুই পক্ষের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সমাধান আসছে, ততদিন এ ধরনের হামলা ও প্রতিহামলা চলতেই থাকবে।
TAG-#হাইফাহামলা #ইসরায়েলইরানযুদ্ধ #মিসাইলহামলা #হাইফাতেলরিফাইনারি #বাজানরিফাইনারি #মধ্যপ্রাচ্যযুদ্ধ #ইরানমিসাইল #ইসরায়েলসংকট #হিজবুল্লাহহামলা #বিশ্বসংঘাত২০২৬