মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন তার ৩৯তম দিনে পৌঁছেছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছুতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এমন উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা একটি আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। ইসলামাবাদ ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ নামে একটি দুই ধাপের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে প্রথমে ৪৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং পরে স্থায়ী শান্তি চুক্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই আলোচনা কি সত্যিই সফল হবে, নাকি শেষ পর্যন্ত হতাশায় পরিণত হবে?
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলেছেন, “চ্যালেঞ্জ ও বাধা সত্ত্বেও পাকিস্তান সংলাপ ও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।” এই কথাগুলো এমন এক সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে স্ট্রেইট অফ হরমুজ খুলে দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত আলটিমেটাম দিয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “যদি চুক্তি না হয় তাহলে পুরো সভ্যতাই আজ রাতে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।” অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে হরমুজ খুলবে না; চায় স্থায়ী সমাধান এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
পাকিস্তানের প্রস্তাব অনুসারে প্রথম ধাপে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি চুক্তি করা হবে, যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই প্রস্তাব ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কেই পাঠানো হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাগাই স্বীকার করেছেন যে পাকিস্তানের মাধ্যমে প্রস্তাব এসেছে এবং তারা এটি বিবেচনা করছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কোনো অস্থায়ী ব্যবস্থায় রাজি নয় যদি না স্থায়ী সমাধানের গ্যারান্টি থাকে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইসলামাবাদ ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক আছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ উভয়ই ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন। পাকিস্তান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫-পয়েন্ট প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ইরানও তার ১০-পয়েন্ট প্রস্তাব পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠিয়েছে। তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে ইসলামাবাদ একটি আঞ্চলিক উদ্যোগ গড়ে তুলেছে।
কিন্তু চ্যালেঞ্জও কম নয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের উপর চাপ বজায় রাখতে চায় এবং বলছে যে কোনো চুক্তিতে ইরানকে অবশ্যই হরমুজ খুলে দিতে হবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা কোনো হুমকির কাছে মাথা নত করবে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন কিন্তু স্পষ্ট করে বলেছেন যে তারা ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠকে যাবে কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ইরান পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আস্থা রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দাবিকে “অগ্রহণযোগ্য” মনে করছে।
ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড নামে পরিচিত এই প্রস্তাবের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করছে দুই পক্ষের রাজনৈতিক ইচ্ছার উপর। যদি ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় তাহলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যেতে পারে, যা বিশ্ব তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে হরমুজ বন্ধ থাকায় তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে চাপ বাড়বে।
পাকিস্তানের এই ভূমিকা তার কূটনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে তুলে ধরেছে। কয়েক বছর আগে যে দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে অনেকে ‘আউটকাস্ট’ বলে দেখত, সেই পাকিস্তান এখন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এটি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কৌশলগত দূরদর্শিতার ফল বলে অনেকে মনে করছেন। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যস্থতা সফল হওয়ার জন্য উভয় পক্ষকে ছাড় দিতে হবে। ইরান যদি হরমুজ না খোলে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি তার হুমকি বাস্তবায়ন করে তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই যুদ্ধ আমাদের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। রেমিট্যান্স, আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি মূল্য—সবকিছুতেই প্রভাব পড়ছে। সরকারের উচিত বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করা এবং কূটনৈতিকভাবে শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা। পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশের মধ্যস্থতা যদি সফল হয় তাহলে এটি পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য ইতিবাচক বার্তা হবে।
এই আলোচনা এখনও চলছে। পাকিস্তান বলছে তারা “ইনডাইরেক্ট টকস” চালিয়ে যাবে। তুরস্ক ও মিসরও সমর্থন দিচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্পের আলটিমেটাম এবং ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণে সময় খুবই কম। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যদি কোনো অগ্রগতি না হয় তাহলে যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে।
পাকিস্তান ইরান মধ্যস্থতা এবং ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড যদি সফল হয় তাহলে এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য একটি বড় সাফল্য হবে। কিন্তু যদি ব্যর্থ হয় তাহলে অঞ্চলটি আরও বড় যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে। বর্তমানে পরিস্থিতি খুবই সংবেদনশীল। আশা করা যায়, সকল পক্ষের বুদ্ধিমত্তা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতার কারণে শান্তি ফিরে আসবে।
TAGS-পাকিস্তান ইরান মধ্যস্থতা, ইরান ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি, ইসলামাবাদ কূটনীতি, মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা, পাকিস্তান পররাষ্ট্রনীতি, ইরান ইসরায়েল যুদ্ধ ২০২৬, মধ্যপ্রাচ্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, শরীফ ইরান আলোচনা, দক্ষিণ এশিয়া কূটনীতি, শান্তি আলোচনা সংবাদ,আন্তর্জাতিকসংবাদ, বিশ্বসংবাদ, ব্রেকিংনিউজ, ট্রেন্ডিংনিউজ, আপডেটনিউজ, বাংলানিউজ, বাংলাসংবাদ, আন্তর্জাতিকখবর, বিশ্বডেস্ক, সংবাদপাঠ